
মোঃ নুর হোসাইন :
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সাবেক চেয়ারপার্সন ও সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার জন্মস্থান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ এর এলাকা হিসেবে বৃহত্তর নোয়াখালী বিএনপির দুর্ভেদ্য ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। বিগত আওয়ামী শাসনামলের ১৭ বছর সীমাহীন অত্যাচার নির্যাতনে কোনঠাসা নেতাকর্মীরা ৫ আগষ্টের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে পুরোদমে রাজনীতির মাঠে ফিরে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী ও লক্ষীপুর জেলার সব কয়টি আসন বিএনপির দখলে থাকলেও নোয়াখালী জেলার মোট ৬টি সংসদীয় আসনের ৫টি তে জয় পেয়েছে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা, একটিতে ভাগ বসিয়েছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট থেকে এনসিপির মনোনীত প্রার্থী।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং আইনত দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় এবারের নির্বাচনে নোয়াখালীতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির মুল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
পুর্বের ধারাবাহিকতায় এবারও অতীত অভিজ্ঞতা, সাংগাঠনিক ভিত্তি ও নিজস্ব ইমেজকে কাজে লাগিয়ে বিএনপির প্রার্থীরা নোয়াখালী-১, নোয়াখালী-২, নোয়াখালী-৩, নোয়াখালী-৪ ও নোয়াখালী-৫ আসনে বিজয় চিনিয়ে আনে। অতীতে নোয়াখালীতে কোন আসনে জামায়াতের উল্লেখযোগ্য কোন সফলতা না থাকলেও এবার কিছু আসনে বিএনপির প্রার্থীদের সাথে জামায়াতের প্রার্থীদের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে।বেশিরভাগ আসনেই গড়ে তুলেছে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বীতা।এবারের নির্বাচনে নোয়াখালীর আসন গুলোতে পুর্বের তুলনায় কয়েক গুন ভোট বেড়েছে জামায়াতের। এছাড়াও প্রথমবারের মতো জামায়াত জোট থেকে নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনে জয় পেয়েছে এনসিপির শাপলা কলি।
নোয়াখালী-১ (চাটখিল-সোনাইমুড়ী) আসনে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক দুইবারের সংসদ সদস্য, ধানের শীষের প্রার্থী মাহবুব উদ্দিন খোকন এক লাখ ২৬ হাজার ৮৩৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মো. ছাইফ উল্যাহ দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৯৮ হাজার ৩৬ ভোট। ব্যক্তিগত পরিচিতি, দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের মামলা পরিচালনা করা, সংগঠনের শক্তিশালী অবস্থান ও হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে মাহবুব উদ্দিন খোকন জয় পেয়েছেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। এছাড়াও ১১ দলীয় জোট থেকে চরমোনাই পীরের দল ইসলামি আন্দোলন বের হয়ে যাওয়ার কারণে এ আসনে ইসলামি আন্দোলনের প্রার্থী হাফেজ জহিরুল ইসলাম এককভাবে নির্বাচন করে হাতপাখা প্রতীকে প্রায় ১২হাজার ভোট পান। যা ধানের শীষের বিজয়ে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
নোয়াখালী-২ (সেনবাগ-সোনাইমুড়ী আংশিক) আসনে বিএনপি চেয়ারপার্সনের সাবেক উপদেষ্টা, সাবেক বিরোধী দলীয় চীফ হুইফ ও সাবেক ৫ বারের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক ধানের শীষ প্রতীকে ৮৩ হাজার ৯৮২ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোট থেকে এনসিপির প্রার্থী সুলতান মুহাম্মদ জাকারিয়া শাপলা কলি প্রতীকে পেয়েছেন ৬৭ হাজার ৫৪ ভোট। পুর্বের অভিজ্ঞতা, সংগঠনের মজবুত অবস্থান এবং আওয়ামী সরকারের শাসনামলে বারবার নির্যাতনের স্বীকার হওয়ায় মানুষের আস্থা অর্জনে সক্ষম হওয়ায় জয়নাল আবেদীন ফারুক কাঙ্ক্ষিত জয় পেয়েছেন বলে মনে করেন স্থানীয়রা৷
নোয়াখালী-৩ (বেগমগঞ্জ) আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য বরকত উল্লাহ বুলু ধানের শীষ প্রতীকে এক লাখ ৪১ হাজার ৩১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মাওলানা বোরহান উদ্দিন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন এক লাখ ২৩ হাজার ৯৪১ ভোট। নিজ পরিচিতি, পুর্বের অভিজ্ঞতা, দলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় এবং কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে হেভিয়েট প্রার্থী হিসেবে বরকত উল্লাহ বুলু জয়লাভ করেছেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
নোয়াখালী-৪ (সদর-সুবর্ণচর) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক ৪ বারের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মো. শাহজাহান দুই লাখ ১৯ হাজার ১৮২ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের ইসহাক খন্দকার দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন এক লাখ ৪৮ হাজার ৯৮৯ ভোট।পুর্বে ৪বার এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুনাম ও অভিজ্ঞতা, ক্লিন ইমেজ, শক্তিশালী সাংগাঠনিক ভিত্তির ফলে আলহাজ্ব মোঃ শাহজাহান প্রত্যাশিত জয় পেয়েছেন বলে বিশ্বাস স্থানীয়দের।
নোয়াখালী-৫ (কবিরহাট-কোম্পানিগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী বিশিষ্ট শিল্পপতি ও ব্যাবসায়ী মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম ধানের শীষ প্রতীকে এক লাখ ৪৭ হাজার ৮০৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন এক লাখ ২০ হাজার ৪৫৩ ভোট। প্রয়াত ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ এর নির্বাচনী এলাকা, বিপদে এলাকার গরীব দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সকল বিভেদ ভুলে দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার ফলে মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বিজয় লাভ করেছেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। এছাড়াও ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমেদ এর স্ত্রী হাসনা মওদুদ বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া থেকে সরে এসে ধানের শীষের প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছে ।
অন্যদিকে, নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট থেকে এনসিপির প্রার্থী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ও জাতীয় নাগরিক পার্টির সিনিয়র যুগ্ম মূখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ শাপলা কলি প্রতীকে ৯০ হাজার ১১৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মাহবুবের রহমান শামীম ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ৬৩ হাজার ৩৭২ ভোট। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া সমন্বয়কদের মধ্যে অন্যতম পরিচিত মূখ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে হাতিয়ার উন্নয়নে ভুমিকা রাখা, হাতিয়াবাসী কে নতুন নেতৃত্বের স্বপ্ন দেখানোয় হান্নান মাসউদের বিজয় লাভে বড় ভুমিকা রেখেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। তবে সে আসনে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম এবং বিএনপির সাবেক উপজেলা সাধারণ সম্পাদক তানভীর উদ্দিন রাজিব বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকায় তা হান্নান মাসুদের জয়ে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : এডভোকেট সালাহ উদ্দিন মাহমুদ মাসুম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : অহিদ উদ্দিন মাহমুদ মুকুল
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : জান্নাতুল ফেরদৌস প্রিয়া