৬ই এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ২৩শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

নিঝুম দ্বীপের গর্ভবতী নারীরা কেন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ?

  • অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট: ০৯:২১:৪০ অপরাহ্ণ, শুক্রবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৫
  • ৮৬৯

স্টাফ রিপোর্টার:
নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার নিঝুম দ্বীপের ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। যেখানে নেই কোনো চিকিৎসক।
প্রসব বেদনায় রাতভর কাতরাচ্ছিলেন নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার নিঝুম দ্বীপের গর্ভবতী নারী মোসাম্মৎ রোকসানা (২৫)। উপায়ান্তর না পেয়ে পরদিন সকালে স্থানীয় ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে নিয়ে যান স্বামী ওছমান আলী। সেখানে নেওয়ার পর অবস্থার বেগতিক দেখে কর্মরত মিডওয়াইফ রোকসানাকে পাঠান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। কিন্তু নদী ও দীর্ঘ সড়কপথ পেরিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছাতে পৌঁছাতে শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে রোকসানার। সেখানকার চিকিৎসক তাঁকে দ্রুত জেলা শহরের জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
দূরত্বের কথা বিবেচনা করে পরিবার তাঁকে ভর্তি করান হাতিয়া উপজেলা সদরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে। সেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন রোখসানা। অস্ত্রোপচারের পর রোকসানার অবস্থা আরও খারাপ হয়। পরে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ২৫০ শয্যা নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পথে মেঘনা নদীতে নৌকায় মৃত্যু হয় রোকসানার। আর এর মধ্য দিয়ে জন্মের পরই মা–হারা হয় রোকসানার নবজাতক সন্তান।
প্রসূতি নারী রোকসানার মৃত্যুর ঘটনাটি নিঝুম দ্বীপের বাসিন্দাদের জন্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত বছরের ১৫ অক্টোবর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত দ্বীপের তিনজন নারী মারা গেছেন সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে। দ্বীপে সরকারি কোনো হাসপাতাল নেই। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রেও কোনো চিকিৎসক নেই। পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়নের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা তলানিতে। এখানে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ বসবাস করলেও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে সরকারিভাবে কোনো হাসপাতাল গড়ে ওঠেনি।
জ্বর, সর্দি-কাশি উপশমের জন্য দ্বীপে তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও সেখানে সেবা পাওয়া দায়। গর্ভবতী নারী কিংবা সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিতে হলে সড়ক ও জলপথে পাড়ি দিতে হয় ৬০ কিলোমিটারের মতো পথ। ততক্ষণে অনেক রোগীর অবস্থাই জটিল হয়ে পড়ে। অনেকে পথেই মৃত্যুবরণ করেন। বাসিন্দারা বলছেন, সব রোগের জন্য স্থানীয় ওষুধের দোকানই ভরসা তাঁদের। স্বাস্থ্যসেবার এমন দশা স্বীকার করে শিগগিরই পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগের কথা জানালেন সিভিল সার্জন।
সম্প্রতি সরেজমিনে নিঝুম দ্বীপের বন্দরটিলায় গেলে কথা হয় সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যাওয়া নারী রোকসানার স্বামী ওসমান আলীর সঙ্গে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, গত ১ নভেম্বর তাঁর স্ত্রী মোসাম্মৎ রোকসানা একরকম চিকিৎসার অভাবেই মারা গেছেন। এলাকায় হাসপাতাল থাকলে তাঁকে এভাবে মরতে হতো না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিঝুম দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় এমন মৃত্যুর ঘটনা মাঝেমধ্যেই শোনা যায়। নিঝুম দ্বীপে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষের বসতি। যাঁদের পেশা নদীতে মাছ শিকার ও কৃষিকাজ। দারিদ্র্যের কারণে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে জেলা সদরে চিকিৎসা নেওয়া অনেকটাই স্বপ্নের। দ্বীপে তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক ও একটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে থাকলেও সেখানে নেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিকের অবস্থাও জরাজীর্ণ।
নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য আনোয়ার হোসেন জানান, এখানে যে তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে, সেগুলোতে হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার নিয়মিত আসেন না। ফলে সাধারণ চিকিৎসাও পাওয়া যায় না।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের একটি সূত্রে জানা গেছে, সরকারের সঙ্গে একসময় যৌথভাবে কাজ করত মা-মনি প্রকল্প। গর্ভবতী মায়েদের পরামর্শসহ স্বভাবিক প্রসব হতো প্রকল্পের অধীনে। কিন্তু বর্তমানে সে প্রকল্পও বন্ধ। ফলে ভেঙে পড়েছে দ্বীপের নারীর স্বাস্থ্যব্যবস্থা।
এ বিষয়ে কথা হয় সিভিল সার্জন চিকিৎসক মাসুম ইফতেখারের সঙ্গে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নিঝুম দ্বীপ পরিদর্শন করেছেন। দ্বীপে ১০ শয্যার একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেখানে চিকিৎসক, নার্সসহ পর্যাপ্ত জনবল থাকবে।
সিভিল সার্জন বলেন, মা-মনি প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়ন পরিবার স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে স্বাভাবিক প্রসব কার্যক্রম চালু রয়েছে। সেখানে গড়ে প্রতি মাসে ২০টি প্রসব হচ্ছে। এ ছাড়া আগামী ফেব্রুয়ারি মাস থেকে দ্বীপের বাসিন্দাদের চিকিৎসাসেবা প্রদানে প্রতি মাসে দুটি মেডিকেল ক্যাম্প করা হবে।

সর্বাধিক পঠিত

নিঝুম দ্বীপের গর্ভবতী নারীরা কেন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ?

আপডেট: ০৯:২১:৪০ অপরাহ্ণ, শুক্রবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৫

স্টাফ রিপোর্টার:
নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার নিঝুম দ্বীপের ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। যেখানে নেই কোনো চিকিৎসক।
প্রসব বেদনায় রাতভর কাতরাচ্ছিলেন নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার নিঝুম দ্বীপের গর্ভবতী নারী মোসাম্মৎ রোকসানা (২৫)। উপায়ান্তর না পেয়ে পরদিন সকালে স্থানীয় ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে নিয়ে যান স্বামী ওছমান আলী। সেখানে নেওয়ার পর অবস্থার বেগতিক দেখে কর্মরত মিডওয়াইফ রোকসানাকে পাঠান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। কিন্তু নদী ও দীর্ঘ সড়কপথ পেরিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছাতে পৌঁছাতে শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে রোকসানার। সেখানকার চিকিৎসক তাঁকে দ্রুত জেলা শহরের জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
দূরত্বের কথা বিবেচনা করে পরিবার তাঁকে ভর্তি করান হাতিয়া উপজেলা সদরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে। সেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন রোখসানা। অস্ত্রোপচারের পর রোকসানার অবস্থা আরও খারাপ হয়। পরে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ২৫০ শয্যা নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পথে মেঘনা নদীতে নৌকায় মৃত্যু হয় রোকসানার। আর এর মধ্য দিয়ে জন্মের পরই মা–হারা হয় রোকসানার নবজাতক সন্তান।
প্রসূতি নারী রোকসানার মৃত্যুর ঘটনাটি নিঝুম দ্বীপের বাসিন্দাদের জন্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত বছরের ১৫ অক্টোবর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত দ্বীপের তিনজন নারী মারা গেছেন সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে। দ্বীপে সরকারি কোনো হাসপাতাল নেই। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রেও কোনো চিকিৎসক নেই। পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়নের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা তলানিতে। এখানে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ বসবাস করলেও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে সরকারিভাবে কোনো হাসপাতাল গড়ে ওঠেনি।
জ্বর, সর্দি-কাশি উপশমের জন্য দ্বীপে তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও সেখানে সেবা পাওয়া দায়। গর্ভবতী নারী কিংবা সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিতে হলে সড়ক ও জলপথে পাড়ি দিতে হয় ৬০ কিলোমিটারের মতো পথ। ততক্ষণে অনেক রোগীর অবস্থাই জটিল হয়ে পড়ে। অনেকে পথেই মৃত্যুবরণ করেন। বাসিন্দারা বলছেন, সব রোগের জন্য স্থানীয় ওষুধের দোকানই ভরসা তাঁদের। স্বাস্থ্যসেবার এমন দশা স্বীকার করে শিগগিরই পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগের কথা জানালেন সিভিল সার্জন।
সম্প্রতি সরেজমিনে নিঝুম দ্বীপের বন্দরটিলায় গেলে কথা হয় সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যাওয়া নারী রোকসানার স্বামী ওসমান আলীর সঙ্গে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, গত ১ নভেম্বর তাঁর স্ত্রী মোসাম্মৎ রোকসানা একরকম চিকিৎসার অভাবেই মারা গেছেন। এলাকায় হাসপাতাল থাকলে তাঁকে এভাবে মরতে হতো না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিঝুম দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় এমন মৃত্যুর ঘটনা মাঝেমধ্যেই শোনা যায়। নিঝুম দ্বীপে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষের বসতি। যাঁদের পেশা নদীতে মাছ শিকার ও কৃষিকাজ। দারিদ্র্যের কারণে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে জেলা সদরে চিকিৎসা নেওয়া অনেকটাই স্বপ্নের। দ্বীপে তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক ও একটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে থাকলেও সেখানে নেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিকের অবস্থাও জরাজীর্ণ।
নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য আনোয়ার হোসেন জানান, এখানে যে তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে, সেগুলোতে হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার নিয়মিত আসেন না। ফলে সাধারণ চিকিৎসাও পাওয়া যায় না।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের একটি সূত্রে জানা গেছে, সরকারের সঙ্গে একসময় যৌথভাবে কাজ করত মা-মনি প্রকল্প। গর্ভবতী মায়েদের পরামর্শসহ স্বভাবিক প্রসব হতো প্রকল্পের অধীনে। কিন্তু বর্তমানে সে প্রকল্পও বন্ধ। ফলে ভেঙে পড়েছে দ্বীপের নারীর স্বাস্থ্যব্যবস্থা।
এ বিষয়ে কথা হয় সিভিল সার্জন চিকিৎসক মাসুম ইফতেখারের সঙ্গে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নিঝুম দ্বীপ পরিদর্শন করেছেন। দ্বীপে ১০ শয্যার একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেখানে চিকিৎসক, নার্সসহ পর্যাপ্ত জনবল থাকবে।
সিভিল সার্জন বলেন, মা-মনি প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়ন পরিবার স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে স্বাভাবিক প্রসব কার্যক্রম চালু রয়েছে। সেখানে গড়ে প্রতি মাসে ২০টি প্রসব হচ্ছে। এ ছাড়া আগামী ফেব্রুয়ারি মাস থেকে দ্বীপের বাসিন্দাদের চিকিৎসাসেবা প্রদানে প্রতি মাসে দুটি মেডিকেল ক্যাম্প করা হবে।